ইউনিয়ন

ইউনিয়ন ফিচারড পোষ্ট
ইউনিয়ন পরিষদ
ইউনিয়ন পরিষদ

ইউনিয়ন পরিষদ পল্লী অঞ্চলের সর্বনিম্ন প্রশাসনিক একক। গ্রাম চৌকিদারি আইনের ১৮৭০ এর অধীনে ইউনিয়ন পরিষদের সৃষ্টি হয়। এই আইনে প্রতিটি গ্রামে পাহারা টহল ব্যবস্থা চালু করার উদ্দেশ্যে কতগুলো গ্রাম নিয়ে একটি করে ইউনিয়ন গঠিত হয়। ইউনিয়ন গঠনের বিস্তারিত দিকনির্দেশনা লেখা রয়েছে বেঙ্গল চৌকিদারী ম্যানুয়্যালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনুচ্ছেদে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি স্থানীয় সরকার পরিষদ ধারণার সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এটির ভূমিকা নিরাপত্তামূলক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তী কালে এটিই স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক ইউনিটের ভিত্তিরুপে গড়ে উঠে।বর্তমানে বাংলাদেশে ৪৫৭১টি ইউনিয়ন আছে।

পটভূমি

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস রয়েছে। অতি প্রাচীন কাল থেকেই আমাদের এই উপমহাদেশে স্থানীয় সরকারের অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায়। সাধারণত স্থানীয় সরকার বলতে এমন জনসংগঠনকে বুঝায় যা অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ভৌগলিক সীমা রেখায় একটি দেশের অঞ্চল ভিত্তিতে জাতীয় সরকারের অংশ হিসেবে কাজ করে থাকে। স্থানীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমম্বয়ে গঠিত সংস্থাকে স্থানীয় সরকার বলা হয়। জাতীয় সরকারের মত স্থানীয় সরকার সার্বভৌম কোন প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। জাতীয় সরকার বিভিন্ন সার্কুলার ও নির্দেশের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। স্থানীয় সরকার নিদিষ্ট এলাকায় কর, রেট, ফিস, টোল প্রভৃতি নির্ধারণ ও আদায়ের ব্যাপারে জাতীয় সরকারের নির্দেশ/ নির্দেশনা অনুসরন করে থাকেন। ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে প্রাচীন ও মধ্য যুগীয় আমলে খ্রীষ্ট পূর্ব ১৫০০-১০০০ অব্দে গ্রাম পরিষদের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া খ্রীষ্ট পূর্ব ৩২৪-১৮৩ অব্দে মৌর্য বা মৌর্য পূর্ব যুগে গ্রাম প্রশাসনের অস্তিত্বের হদিছ পাওয়া যায়। ব্রিটিশ শাসকদের আগমনের পূর্বে তৎকালীন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে অধিকাংশ গ্রামে পঞ্চায়েত প্রথা প্রচলিত ছিল। তখন পঞ্চায়েতের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫ জন। জনগণের মতামতের উপর নির্ভর করে সামাজিক প্রয়োজনে পঞ্চায়েত প্রথার উদ্ভব ঘটে। আইনগত তাই এগুলোর কোন ভিত্তি ছিল না।

ব্রিটিশ শাসকদের আমলে অর্থনৈতিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কারণে ও ব্রিটিশদের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করার জন্য লর্ড মেয়ো ১৮৭০ সালে চৌকিদারী আইন পাশ করেন। এই আইনের ফলে প্রথমবারের মত স্থানীয় সরকারের উদ্ভব হয় এবং পঞ্চায়েত প্রথার পুনরাবৃত্তি ঘটে। চৌকিদারী পঞ্চায়েতের সদস্য সংখ্যা ছিল ০৫ জন এবং জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট পঞ্চায়েতের সকল সদস্যকে ০৩ বৎসরের জন্য নিয়োগ করতেন। চৌকিদারী পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় স্থানীয় স্বায়ত্ব শাসন আইন প্রবর্তনের মাধ্য দিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয়। ইউনিয়ন কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ০৫-০৯ জন এবং গ্রামবাসী কর্তৃক নির্বাচিত হতেন এবং ইউনিয়ন কমিটির পাশাপাশি চৌকিদারী পঞ্চায়েত কাজ করতো। এর কারণে দ্বৈত শাসনের অসুবিধা সমূহ প্রকটভাবে দেখা দেয়। অতঃপর ১৯১৯ সালে চৌকিদারী পঞ্চায়েত ও ইউনিয়ন কমিটি বাতিল করে ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডের সদস্য ১/৩ অংশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক মনোনয়ন দান করতেন অবশিষ্ট সদস্যগণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হতেন। বোর্ডের সদস্যগণ তাদের মধ্য থেকে প্রেসিডেন্ট ও একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতেন। তাদের কার্যকাল ছিল ৩ (তিন) বৎসর। তবে ১৯৩৬ সাল হতে ০৪ বৎসর করা হয় এবং মনোনয়ন প্রথা ১৯৪৬ সালে রহিত করা হয়।

মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ, ১৯৫৯ এর অধীনে ইউনিয়ন কাউন্সিল গঠন করা হয় এবং সদস্য সংখ্যা করা হয় ১০-১৫ জন। মোট সদস্যের ২/৩ অংশ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতেন এবং অবশিষ্ট ১/৩ অংশ মহকুমা প্রশাসক সরকারের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দিতেন। ১৯৬২ সালে শাসনতন্ত্র প্রবর্তনের ফলে মনোনয়ন প্রথা রহিত হয়। সদস্যগণ তাদের মাঝ থেকে একজন চেয়ারম্যান ও একজন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করতেন। পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যানের পদটি বাতিল করা হয়। ইউনিয়ন কাউন্সিলের কার্যকাল ছিল ০৫ বছর। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের যে কাঠামো  প্রচলিত রয়েছে তার সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে প্রণীত কিছু কিছু আইনের মাধ্যমে। অষ্টাদশ শতকের শেষেরদিকে শহর অঞ্চল এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষেরদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়।

ইতিকথা

বর্তমানে তিন ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কাজ করছেঃ

  • (ক) ইউনিয়ন পরিষদ,
  • (খ) উপজেলা পরিষদ,
  • (গ) জেলা পরিষদ।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা উত্তরকালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৭,১৯৭২ বলে ইউনিয়ন কাউন্সিল রহিত করে ইউনিয়ন পঞ্চায়েত নামকরণ করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২২, ১৯৭৩ অনুযায়ী ইউনিয়ন পঞ্চায়েতের নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করা হয় ইউনিয়ন পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যক্ষ ভোটে ০৯ জন সদস্য, ০১ জন চেয়ারম্যান ও ০১ জন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ ১৯৭৬ অনুযায়ী ভাইস চেয়ারম্যানের পদটি বাতিল করা হয়। এছাড়া ০২ জন মনোনীত মহিলা সদস্য এবং ইউনিয়ন পরিষদকে ০২ জন প্রতিনিধি সদস্য (কৃষকের মধ্য থেকে) পরিষদে অর্ন্তভূক্ত করা হয়। সর্বোপরি ১৯৮৩ ও ১৯৯৩ সালে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশ অনুয়ায়ী প্রত্যক্ষ ভোটে ০১ জন চেয়ারম্যান ও ০৯ জন সাধারণ সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনে ০৩ জন মহিলা সদস্য নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদকাল হয় ০৫ বছর।

নামকরন

ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ সাল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নাম সভাপতি ১৮৭০-১৮৮৫ চৌকিদারী পঞ্চায়েত, ১৯১৮ ইউনিয়ন কমিটি পঞ্চায়েত, ১৯১৯-১৯৩৫ ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট, ১৯৩৬-১৯৫৮ ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট, ১৯৫৯-১৯৬১ ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান, ১৯৬২ ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান, ১৯৬৩-১৯৭১ ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান, ১৯৭২ ইউনিয়ন পঞ্চায়েত, ১৯৭৩-১৯৭৫ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, ১৯৭৬-১৯৮২ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, ১৯৮৩- বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান।

                                                                                                                            পরবর্তী লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *