শিশু পরিচর্যা

শিশু পরিচর্যা
কোনটা ভুল, কোনটা ঠিক শিশুর পরিচর্যায়-

সব মা-বাবাই শিশুর সঠিক যত্ন নিতে চান। কিন্তু আমরা অনেকেই সচেতনতার অভাবে কমবেশি অনেক ভুল করে থাকি। আসুন আমরা জেনে নেই শিশুর পরিচর্যায় কোনটা ভুল এবং কোনটা সঠিক।

জন্মের পরপরই শিশুর মুখে মধু দিলে কী মুখ মিষ্টি হয়?

কথাটা কেবল ভুলই নয়, বিপজ্জনকও বটে। জন্মের পর পরই শিশুকে মায়ের বুকের প্রথম শালদুধ দিতে হবে। হলুদ তরল দুধ বলে অনেকে এটা ফেলে দিতে বলেন। কিন্তু এই শালদুধেই আছে শিশুর প্রথম প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদান। তাই নবজাতককে মধু, চিনির পানি, মিছরির পানি বা কৌটার দুধ দেওয়া থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে।

ঘুমের মধ্যে বোতলে করে দুধ খাওয়ালে কী শিশু পর্যাপ্ত খেতে পারে?

জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। সম্পূর্ণ বা আংশিকও টিনের দুধ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। মা বাইরে গেলে পরিষ্কার পাত্রে বুকের দুধ তুলে রেখে যাবেন। সেটা বোতলে নয়, বাটি-চামচ দিয়ে যন্ত করে খাওয়াতে হবে। তাই শিশু ঘুমের মধ্যে বা জাগরণে—কখনোই বোতলের দুধ শিশুকে দেবেন না। ছোট শিশুদের কান্না নিবারনের জন্যও চুষনিতে অভ্যাস করানো ঠিক নয়।

শিশুর খাবার ব্লেন্ডারে মিহি করে দেওয়া কী উচিত?

শিশুর বয়স ছয় মাস হয়ে গেলেই তাকে বাড়িতে তৈরি খাবার দিন, দোকান থেকে কেনা খাবার নয়। অতিরিক্ত চালের গুঁড়া, সুজি, বার্লি ইত্যাদি খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। সব ধরনের খাবারই দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ব্লেন্ডারে মিহি করার প্রয়োজন নেই। ভাত বা খিচুড়ি, সবজি, মাছ, ডাল, তেল মিশিয়ে নরম করে খাবার তৈরী করতে হবে।। ব্লেন্ডারে তৈরি খাবার খেলে শিশুর স্বাদগ্রন্থির বিকাশে বাধাপ্রাপ্ত হয়। শিশুকে কখনো জোর করে খাওয়ানো ঠিক নয়। খাবার নিয়ে শিশুর পেছন পেছন দৌড়ানো এবং টিভি শো দেখিয়ে, গেম খেলতে বসিয়ে মনোযোগ সরিয়ে খাওয়ানোও ঠিক নয়। খিদে পেলে শিশু এমনিতেই খেতে চাইবে। একসাথে নানান পদের খাবার পরিবেশন করলে শিশু দ্বিধায় পড়ে যায়। আবার সব সময় শুধু শিশুর পছন্দের খাবার দিতে হবে, সেটাও ঠিক নয়। এতে অন্য খাবারের প্রতি আগ্রহ জন্মানোর সম্ভাবনা কম থাকবে।

 

ছোটবেলা থেকেই সবকিছু চাওয়া কী উচিত?

শিশুদের একেবারে ছোট থেকে সব বিষয়ে (যেমন বইপড়া, নাচ-গান, ছবি আঁকা ইত্যাদি) পারদর্শী করে তুলতে অনেকে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়ে পড়েন। মুঠোফোনে গেমস, আইপ্যাড চালাতে দেখে অবাক ও খুশি হন। এর কোনোটাই শিশুর জন্য ভালো লক্ষণ নয়। অনেক শিশুর বাবা-মা আদবকায়দা ইত্যাদি নিয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েন। কোনো কিছু নিয়েই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি উচিত নয়। অনেকে তাদের সন্তানকে এত ভালোবাসেন ও প্রশ্রয় দেন যে তাকে সকল ধরণের কাজ থেকেই বিরত রাখেন। তাদের জামাকাপড় পরানো বা স্কুলব্যাগ বহন করার জন্যও কাজের লোক রাখেন। দৈনন্দিন কাজকর্ম, যেমন খাওয়াদাওয়া, জুতা ও পোশাক পরা, ব্যাগ গোছানো ও বহন করা এসবে শিশুকে সাহায্য করা যেতে পারে, কিন্তু পুরোটাই করে দেবেন না। তাকে স্বাবলম্বী হতে শেখাতে হবে।

 

শিশুকে কী সময় দেওয়া উচিত?

সন্তানকে সুখে-শান্তিতে রাখার জন্য হয়তো দিনভর খাটাখাটনি করছেন। কিন্তু শিশুরা আসলে এই রেডিমেড আরাম বা সুখ চায় না, চায় আপনার মূল্যবান সময়। শিশুর সাথে ভাবের আদানপ্রদান, গল্পগুজব, খেলাধুলা তার বিকাশে অনেকটাই সাহায্য করবে। নিজের কাজে ব্যস্ত থাকলেও তাকে সঙ্গী করে নিন। যেমন ধরুন মা ঘরের কাজে শিশুকে সঙ্গে নিতে পারেন, টুকটাক এটা-ওটা এগিয়ে দিতে দিতে অনেক সময় কাটানো যেতে পারে। শিশুকে টিভির কার্টুন শো দেখতে বসিয়ে বা মুঠোফোনে গেমস ধরিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকবেন না।

শিশুর সামনে সংযত আচরণ কীরুপ প্রভাব ফেলে?

শিশুদের মনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়। শিশুরা যেকোনো প্রশ্ন করলে তার উত্তর না দিয়ে বরং ধমক দিয়ে তাকে অনেকে থামিয়ে দেন। বাড়িতে অতিথি আসলে তার সামনে কথা বললে বিরক্ত হন। এটা উচিত নয়। সব অবস্থাতেই তাদের কথা গুরুত্বের সঙ্গে শুনা উচিত। শিশুর সামনে নিজেরা কথা কাটাকাটি, চিৎকার, ঝগড়া করা বা কাউকে মারধর বা গালাগাল করা একেবারেই বিরত থাকতে হবে। ধূমপান যথাসম্ভব বর্জন করুন। শিশুর সামনে কখনো মিথ্যা বলবেন না। কোনো কিছুতে দক্ষতা কম বলে তাকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে বকাবকি করা থেকে বিরত খাকতে হবে। শিশুর সাফল্যে প্রশংসা করুন এবং উৎসাহ দেওয়া উচিত। কখনো কোন ভুল বা অন্যায় করলে বুঝিয়ে বলুন, শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *